হেরিটেজ
আমি, কেমন যেন একটা মানুষ,
নিজের কাছে নিজেই বেমানান,
দেখলেই তেমন কিছু আজকের জমানায়,
ফিরে যাই পুরানো দিনের আঙিনায়।
আমার আগলানো ঝুলির ঘাড় টপকে,
অগ্রাধিকারের আধিপত্য বিস্তারে,
চটজলদি আত্ম জাহিরের তাগিদে,
স্মৃতির উল্লেখ্য দ্রষ্টব্য সামগ্রী
যখন একে অপরের সঙ্গে লিপ্ত -
বাকবিতণ্ডা, ধস্তাধস্তি, রেষারেষিতে,
কেন জানিনা আমি
বেজায় উপভোগ করি।
আমি, কেমন যেন একটা মানুষ,
নিজের কাছে নিজেই বেমানান।
হারিয়ে যাওয়া ঊষালগ্নে,
মেঠোপথে, দূলকি চালে গরুর গাড়ি,
গাড়োয়ানের মন খোলা উদাত্ত কন্ঠে
গোধূলি বেলায় ঘরমুখী মেঠো সুর,
ইমারত, পথঘাট, গাড়ি বারান্দা,
হারিয়ে যাওয়া জীবন,
হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য,
হারিয়ে যাওয়া সহবত,
সব কিছুই আগলাতে চায় এ মন
আপন করে, আপোষহীন অহংকারে।
আমি, কেমন যেন একটা মানুষ,
নিজের কাছে নিজেই বেমানান।
ভোরের আধফোঁটা আলোয়,
ঘুম জড়ানো কানে,
দুমুখো ট্রামের টিং টিং শব্দ,
আজ ও মনে পড়ে যায়,
লাইনের ঘড় ঘড় আওয়াজ
বাড়ির দোর গোড়া হয়ে
বাঁক নেওয়া রাস্তা ঘেঁষে, এগোয়
সামনের স্প্রিংক্লার থেকে জল ছিটিয়ে
চলার পথে, লাইন সাফাইয়ের তাগিদে,
আমার তখন শৈশব বেলা,
অবাক চোখে শুধুই চেয়ে থাকা।
মনে পড়ে যায়,
আমার তখন কৈশোর বেলা,
শীতের ভোরে, রাস্তার পাশে চাপা কলে,
লোহার বড় মাপের চাবি ঘুরিয়ে,
রাস্তা জুড়ে হোস পাইপ বিছিয়ে,
গঙ্গার পবিত্র মুক্ত ধারায়
নিয়মিত, পিচে মোড়া রাস্তা ধোয়া।
চোখে আজও ভাসে,
আমার কাঁচ বারান্দার গা ঘেঁষে,
গ্যাস বাতির ল্যাম্পপোস্টে, দুবেলা
মই কাঁধে, বাতিওয়ালার আনাগোনা
জ্বালতে সাঁঝের স্নিগ্ধ নীলাভ বাতি,
ফের, "ফু"দিতে ফেরা তার কাকভোরে,
তখন তো অচৈতন্য আমি, ঘুমের দেশে,
টু টা কোন শব্দ নেই আমার ঠোঁট জুড়ে।
স্কুল শেষে, বারান্দার গরাদের ফাঁকে
পা ঝুলিয়ে তারই অপেক্ষায়
পথ চেয়ে থাকা এক মোড়ক,
লাল নীল সাদা সবুজ হলুদ
মৌরী লজেন্স পাবো বলে।
ঝাঁকা মাথায় বাজনা ওয়ালা,
বেহালা বাজিয়ে খর্ খরি্'র শব্দ-টেনে
এগিয়ে যায় পায়ে পায়ে পাড়া পেরিয়ে
ছবি তার আজও ছুঁয়ে যায় আমায়।
প্রগতির টানে সব কেমন যেন পাল্টে গেল
কে কোথায় যে হারিয়ে গেলে, জানা নেই।
ধ্বংসাবশেষের ধূসর সাক্ষী হয়ে
নুইয়ে পড়া অনেক স্মৃতিই আমাকে,
আজ ও নাড়া দিয়ে যায়।
হগ মার্কেটের কেন্দ্রবিন্দুতে,
ঐতিহাসিক ধ্বংসের সাক্ষী,
স্মৃতির বাহক একটি কামানের
নিঃশব্দ নিদর্শন, ভাবায় আমায়
রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আর্তনাদ
শত শত বলিদান পলাশীর প্রান্তরে।
এই বাজার ঘিরে, সকাল হলেই
ভিস্তি কাঁধে, ভিত্তি ওয়ালাদের ব্যস্ততা,
ঝুঁড়ি কাঁধে মাল বাহকদের গ্রাহক খোঁজা,
বুলেভার্ডের গা ঘেঁষে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে
ঘোড়ায় টানা ভাড়ার গাড়ি, সন্মুখে তার
ঘোড়াদের পিপাসা নিবারণে নির্মিত
ঢালাই লোহার জলাধার।
কৌতুহল বশত, জিগ্গেস করলাম,
কেতাদুরস্ত একটি গাড়ির কোচওয়ানকে,
চাচা, এই গাড়ির "বেল" আছে?
কোচওয়ানের ডান পায়ের পাতার চাপে
পায়ের সামনেয় পাটাতনে সাঁটানো
পেতলের বড়ো বাটি থেকে বেরোলো
আওয়াজ টং টং টং, মুচকি হেসে,
কোচওয়ান টান দিলো জোড়া লাগামে,
চললো গাড়ি টং টং শব্দে চলার পথে।
নজর কাড়ে, বাঙালি দোকানিদের হাসিমুখে,
বিদেশি খদ্দেরদের দৃষ্টি আকর্ষণে,
ভাঙা ভাঙা ইংরেজি মেশানো বাংলায়
সবিনয় আন্তরিক আমন্ত্রণ।
কেমন যেন মনে হয়,
এই তো সেদিন সব ই ছিল,
পুরানো এ সব কথা ভাবতে,
বড্ডো ভালো লাগে।
এখন সবাই ছুটছে আর ছুটছে,
ব্যাস্ত সবাই ভাবছে শুধুই,
আজ কেমন গেল, কাল কেমন যাবে?
আমি, কেমন যেন একটা মানুষ,
নিজের কাছে নিজেই বেমানান,
দেখলেই তেমন কিছু আজকের জমানায়,
ফিরে যাই পুরানো দিনের আঙিনায়,
হয়তো আড়ালে আবডালে,
কেউ কেউ বলে, বেজায় সেকেলে,
আজকের জমানায়,
বড্ডো বেমানান, বড্ডো বেমানান।।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন